সুনামগঞ্জ

টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকাভাসান

প্রকাশ : 14 অক্টোবর 2011, শুক্রবার, সময় : 11:43, পঠিত 1200 বার

ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ মুকুল
জল জল হাওড়ের ডাক। শরৎ ঋৃতু। ভাদ্রের পূর্ণিমা। নৌকো ভ্রমণ। পরিযায়ী পাখিদের অভয়া আশ্রম (শীত ঋৃতুতে)। এখন,এ জলাশয় নানান প্রজাতির মাছেদের আবাসন। উত্তর দিগন্তে মেঘছোঁয়া সবুজ সবুজ পাহাড়। সবকিছু মিলিয়েই টাঙ্গুয়া নিসর্গের আকর্ষণ-অপূর্ব। এ যেন পর্যটনের স্বর্গ রাজ্য। ময়মন সিংহের গ্রীণলিফ টুর্সের প্রোগ্রাম :টাঙ্গুয়ার হাওড়ে নৌকা ভ্রমণ। গ্রীনলিফস টুরস একটি পর্যটন শিল্পের প্রতিষ্ঠান। আমিও নিশাচরের মতো গভীর রাতে মেলান্দহ থেকে জামালপুর টাউন জংশন।এখান থেকেই ময়মন সিংহ জংশনের রেইল পথে ইন্টারসিটি যমুনা ট্রেনে চেপে বসেছি। পু-পু ঝিক্ ঝিক্ ময়মনসিং/ ঢাকা যেতে কতদিন। রাতভোর করে এসে পৌঁছালাম ময়মনসিং (ময়মনসিংহ)। চোখে ঘুম ঘুম জ্বালা। ইয়াজদানী কোরাইশী, ডা.আমিনুর ইসলাম,ডা.বিধান চন্দ্র রায়, কীটপতঙ্গের গবেষক ডা. জাহাঙ্গীর আলম, এডভোকেট সেলিম, লিটন সাহা , তিন নম্বর প্ল্যাট ফর্মে এসে পৌঁছালেন। মোহনগঞ্জের লোকাল ট্রেণ সকাল ৬টায় ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জ অভিমুখে ছেড়ে যাবে। এরই মধ্যে মিস্টিরশিক মি.মুন্নাভাই,কবি শহীদ আমেনী রুমী ,মামুন, ঢাকার জ্জামান,বর্ষিয়ান ভ্রমণ পিপাসু এবং লেখক মোহাম্মদ রফিক সাহেব, সাইকেলিস্ট এবং ট্রেকার সুব্রত দাস নিতীশ,ব্যাঙ্কার কামরুজ্জামান  সর্বমোট ১৬জন যাচ্ছি টাঙ্গুয়াহাওরে ভাদু পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে। সোজা কথায় ইঞ্জিন-নৌকায় টাঙ্গুয়া ভ্রমণে। রেলগাড়ীর গার্ডসাহেবের সবুজ পতাকা নড়ে উঠতেই ট্রেন ছাড়ল। রেলপথের দুপাশে সবুজ ক্ষেত খামার আম কাঁঠাল সুপারী নারকেলের বাগান বাঁশঝার কলাবনের ছায়া ঘেরা গ্রাম-ঘর। লোহার পুলদিয়ে খাল নদী পেরুনোর ঝমার ঝম শব্দ। শাপলাফোটা জলে দলবেঁধে হাসেরা ডুব সাঁতারে গুগলি শামুক খাচ্ছে। কোমরে খালই বাঁধা; কাঁধে ঠ্যালা জাল কিশোরের দল। মেঠো পথে হাঁটছে জলাশয়ের দিকে মাছ শিকারে। এ যেন্ শিল্পী কায়ূম চৌধুরীর  জলরঙের চলমান গ্রাম চিত্র। ঘন্টা তিন প্যাসেঞ্জার প্যাক্টআপ ট্রেনে ভাদ্রের দমফাঁস গরমে ঘেমে নেয়ে গৌরীপুর, নেত্রকোনা,বারহাট্টা হয়ে মোহনগঞ্জে এসে পৌঁছালাম। মোহনগহ্জ খুব প্রাচীন মাছের মোকাম। তবে সরক পথ এবং রেল পথের কোন সংস্কার নেই। আঁষ্টে গন্ধ নাকে নিয়েই ট্রলার ঘাটের পথ। কবি রইস মনরম তার ত্রী ফাতেমা পারভীন(সাংস্কৃতিক কর্মী) এবং মুক্তেশ্বর সাংস্কৃকি সংগঠনের বালক বালিকাদের নিয়ে শাপলা ফুলের স্তবক দিয়ে সরল এবং কোমল আন্তরিকতায় আমাদের সবাইকে স্বাগত জানাল। কবি মনরমের এ আন্তরিকতা আমাদের মনকে স্মৃতি বহ করল। ভাল লাগল মোহনগঞ্জ বাসির উষ্ণ হার্দতা।
হাওরের জলে নৌকাভাসান ভ্রমণ যাত্রা হল শুরু। নদীর জলে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল করচ গাছের বন পেরিয়ে দিগন্ত ছোঁয়াতাহের পুর এবং ধর্মপাশার ২৬ বর্গ কি.মি আয়তনের ৫০টি বিলের টাঙ্গুয়ায় পৌঁছালাম। ডা.ভিধান বাবু এ অঞ্চলের মানুষ । তাঁর বাড়ি মধ্য-পাড়ায়। তিনি জানালেন এ অঞ্চলের জনকন্ঠে প্রচলিত আছে:৬ কুড়ি কান্দা ৯ কুড়ি বিল নিয়ে এ হাওড় টাঙ্গুয়া। সত্যি বলতে কী দিগন্ত ব্যাপ্ত জল আর জল। চিক্ চিক্ তরঙ্গ রাশি। পশ্চিমে কুশিয়ারা নদী পূর্বে যাদুকাটা নদী টাঙ্গুয়া ছুঁয়ে। উত্তরে মেঘালয়। ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় তিন চার হাজার ফিট উচ্চতার সবুজ পাহাড়ে ঘেড়া। নিসর্গে মেঘ পরীদের হামাগুড়ি। বরফ আর নৌহোটেল থাকলে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের ডাল লেক কেও হার মানাতো! ট্যাকের হাট। গোধুলির সোনালী মেঘে এ হাওড় যেন রোম্যান্টিক হয়ে ওঠে। ফুরফুরে বাতাসে নৌকোর ছৈয়ে বসে দোল খাওয়া পর্যটণকে একটা মনোরম মাত্রা এনে দেয়। এ যেন বর্ণনাতিত ভ্রমণ জগৎ।
নৌকোর ছৈয়ের ওপর জলসা। গান কবিতা দর্শণ প্রত ভাবনা অভিব্যক্তি বিকাশ। চাঁদের আলোয় চলছে হাট জলসা। নৌকোর আরাম দোলায় ষোল কলার চাঁদনী রাত হয়ে ওঠছেএকদম ফাটাফাটি ! চোখ বন্ধ করলেই যেন মনে হচ্ছে সুরমা ধনু দিয়ে ভেসে চলেছি মেঘনায়। জীবনান্দে। কবিতার মতো হয়ে ওঠছে ছন্দপ্রাণ। টাঙ্গুয়ায় নৌকাভাসান শরৎ মেঘ লুকোচুুরির জ্যোৎা ধোয়া অবকাশ পর্যটন। তওহিদুল হক চাকুরী সূত্রে টাঙ্গুয়া হাওড় ঘোরা মানুষ। সেও আমাদেও জলসায় ওয়েছেন। হাওড়ের তরঙ্গে শৈবাল উদ্যানের বুকথেকে ওঠে কল্লোল। টাঙ্গুয়া ভাসতে থাকে সুর্যোদয়ের লোহিত আলোয়। গোলাবাড়ির হিজল করচ বনে পাখিদের কলরব। মুগ্ধ টাঙ্গুয়ায় জলদাসদের ডাকাডাকিতে ঘুমভাঙে। লালদেহ ১৬টি দেড়ফুটি রুই তরতাজা কথা বলতে থাকে জলদেবতাদের। টাঙ্গুয়া হাওরের নিসর্গের রূপকথা। মেঘ জল প্রকৃতির কথা। সাইবেরিয়ান পরিযায়ী পাখিদের এ হাওরে রিফিউজি হয়ে অতিথি বসবাসে সংসার পাতার গল্প। এ গল্পই মনে করিয়ে দেয় পরম্পরায় এ অঞ্চলে  পাখিদের আগমনের কথা প্রচ্ছদ। সহজেই বোঝা যায় যে, হাজার হাজার বছর পূর্বে এখানে হ্রদ ছিল। আবার পাঁচ শ বছরের আগেই হারিয়ে যাবে এ হাওরের জল। যেমন করে নদীদের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। নৌকো ভাসান চলছে দিগন্ত বিতৃত টাঙ্গুয়ার জলে।
টাঙ্গুয়ায় পর্যটনে না এলে  এর প্রকৃতি স্বদ মিলে না। তাই পর্যটনের আহ্বান অবকাশে জল ভ্রমণে টাঙ্গুয়ার শোভা দেখে যান।
লেখক: পর্বতারোহী,কবি,ক্রীড়াবিদ,পাখি প্রেমিক, হোমিও চিকিৎসক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ।
মোবাইল নম্বর: +৮৮ ০১৭১১ ৪৬৮ ৭৮০ ।




Copyright @ 2004-2019 MalihaTravels.com. All Right Reserved.